তাবেদার রসুল বকুল, ম্যানচেস্টার (যুক্তরাজ্য)

বাঙালির প্রবাসযাত্রার ইতিহাস বিস্ময়কর এবং প্রবাসযাপন সংগ্রামমুখর। নানা রকম সমস্যা ও দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে তারা শুধু জীবনযাপন করেননি, সংস্কৃতিরও লালন করেন। প্রতিষ্ঠা করেন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আধিপত্য। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন। বিশ্বের যে ক’টা শহর প্রথম সারি দখল করে আছে তার মধ্যে লন্ডন অন্যতম। আবার কারও জন্য লন্ডন স্বপ্নের শহর।
লন্ডন শহর টেমস নদীর পাড় ঘেঁষে (River Thames) দাঁড়িয়ে আছে। লন্ডনের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে টেমস নদী বিখ্যাত। লন্ডনের আয়তন ৬১০ বর্গমাইল। সিটি অব লন্ডন (City Of London) লন্ডন শহরের কেন্দ্রবিন্দু।
যুক্তরাজ্যে ৭ লক্ষাধিক বাংলাদেশি বসবাস করে। বেশিরভাগ মানুষ আবার লন্ডন শহরে বাস করে। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায়।
লন্ডনের বাইরে যেসব শহরে বাংলাদেশি মানুষের বসবাস তারমধ্যে– বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ওল্ডহাম, হাইড, লিডস, শেফিল্ড, লিবারপুল, কার্ডিফ, নিউক্যাসল, এডিনবরা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আরও অনেক শহর রয়েছে যেখানে বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলামের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ‘লস্কর’ নামক আমাদের জাহাজিরা ভারত উপমহাদেশ থেকে প্রথম যুক্তরাজ্যে গমনকারী। এই লস্করদের ইতিহাস কোথাও সবিস্তারে লিপিবদ্ধ হতে চোখে পড়েনি। অনুমান করা হয়, এই জাহাজি লস্কর হচ্ছে সিলেটিদের পূর্বপুরুষ।
যুক্তরাজ্যে বাঙালি বা বাংলাদেশি কিছু সংখ্যক বাঙালি জাহাজের নাবিক ও শ্রমিকের কাজ নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৮০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কিছু বাঙালি ছাত্র ও পেশাদার ব্যাক্তি শিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যেতে শুরু করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মাইকেল মধুসুদন দত্ত। যিনি ১৮৪০ সালে যুক্তরাজ্যে আসেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুক্তরাজ্যে বেশ কয়েকবার আসেন। প্রথমবার আসেন ১৮৭৮ সালে তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ ১৮৮০ সালে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ না করে ভারতে চলে যান। দ্বিতীয় বার আসেন ১৯১২ সালে। আবদুল রসুল আসেন ১৮৮৮ সালে। তিনি Oxford University থেকে BA ও MA ডিগ্রি লাভ করেন পরে তিনি Bar-at-Law করেন The Honourable Society of The Middle Temple থেকে। পরে ১৮৯৮ সালের ৯ জুলাই আবদুল রসুল B.C.L (Bachelor of Civil Law) ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি (বংশোদ্ভূত) যিনি এই ডিগ্রি লাভ করেন। B.C.L Examination it is the highest Examination in Law.পড়াশোনার জন্য তিনি ৯ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। পরে তিনি একই বছর ১৮৯৮ সালে ভারতের কোলকাতায় চলে আসেন।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
আঠারো শতকের পর থেকে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিপুলসংখ্যক বাঙালি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ লাভ করে। সত্তর দশকের পর থেকে বাঙালিকে আর পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাঙালি তাদের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা দিয়ে গড়ে তোলেন নতুন এক সমাজ। বাংলাদেশের বাইরে একখণ্ড বাংলাদেশ, যা তৃতীয় বাংলা নামে খ্যাত। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ব্যবসা ও বাণিজ্যতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে আমাদের ‘তৃতীয় বাংলা’। প্রচার ঘটতে থাকে বাঙালির বাঙালিয়ানা। এখন প্রতি বছর ঈদ উৎসব, পিঠা উৎসব, বৈশাখী মেলা, কবিতা সন্ধ্যা, বইমেলা, সংগীত সন্ধ্যা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডন ছাড়াও এসব অনুষ্ঠান লন্ডনের বাইরেও বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
আমরা পাঁচজন নাজমা ভাবি, মিথুল ভাবি, মোস্তাক ভাই, প্রবাল ভাইসহ আমি বকুল এক গাড়ি করে ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল। আগের দিন তিনজন টেক্সট করে জানিয়ে দিলেন যেতে পারবেন না। শেষমেশ আমি আর মোস্তাক ভাই গত রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে লন্ডনের পথে রওনা দিই সকাল ৮টায়। ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনের দূরত্ব প্রায় ২০০ মাইল। পৌঁছাতে সময় লাগবে আনুমানিক চার ঘণ্টা। গাড়ি কখনো ৭০ মাইল কখনো ৮০ মাইল বেগে চালাচ্ছি আমি। গাড়িতে আমরা নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। কবিতা আর গল্পে জমে উঠল আমাদের যাত্রা পথ। লম্বা রাস্তা তাই মধ্যে সার্ভিসে একটু কফি বিরতি নিলাম। দিনটা যে ভালো যাচ্ছে বুঝতে বাকি থাকল না আমাদের। প্রবাসে এরকম মজা করে কোথায় যাওয়া যেন পূর্ণিমার চাঁদ হাতে পাওয়া।
আমরা ঠিক সাড়ে ১২টায় লন্ডন ব্র্যাডিআট সেন্টারে গিয়ে পৌঁছলাম। যেখানে বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
এবার লন্ডনের বইমেলা ত্রয়োদশ (১৩তম) আসর। আয়োজক সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য। মেলা চলবে দুদিন ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা থেকে রাত ১০টা।
দুপুর ২টায় ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মাহমুদ শাহ্ কোরেশী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক কবি শামীম আজাদ, একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী শুভ্র দেব, কানাডা আগত কবি আবুল হাসিব ও কবি রোকসানা লেইস।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
এবারের মেলায় কবি আতাউর রহমান মিলাদকে গুনিজন পদক, ছড়াকার দিলু নাসেরকে সাহিত্য পদক, কবি মোসাইদ খান ও নাট্যকর্মী স্মৃতি আজাদকে বেস্ট পারফরমার পদকে ভূষিত করা হয়।
এই মেলায় প্রতিবারের মতো দেশ থেকে বিভিন্ন প্রকাশনী অংশ নেয়। এরমধ্যে ছিল– দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, সাহিত্য প্রকাশ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, স্বরবৃত্ত প্রকাশক, পরিবার পাবলিকেশন, কবি প্রকাশনী, অনিন্দ্য প্রকাশ, অন্বেষা প্রকাশন এবং অভ্র প্রকাশ।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
বইমেলায় স্বরচিত কবিতা পাঠ, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান দিয়ে সাজানো হয় বইমেলা। মেলার কারণে বিভিন্ন শহরে থেকে আসা সকল কবি–সাহিত্যিকের সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি উদয় শংকর দুর্জয়, সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কবি সভাপতি মোহাম্মাদ ইকবাল।
মেলার প্রথম দিন হল ভরতি বইপ্রেমি ও স্থানীয় বিপুলসংখ্যক কবি, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
অনেক লেখক বন্ধুদের সাথে দেখা হলো, কথা হলো, আড্ডা হলো। এই মজাতো সব জায়গায় পাওয়া যায় না। যাদেরকে মিস করেছি মন খারাপ করবেন না, অন্য সময় দেখা হবে।
কবি গবেষক ফারুক আহমেদ আমার আপনজন, দুপুরের খাবারের জন্য টোকেন দিলেন, ধন্যবাদ ফারুক ভাই। মনে রেখেছেন।

লন্ডন বইমেলার ত্রয়োদশ আসরের খণ্ডচিত্র। ছবি: লেখক
মেলা থেকে সন্ধ্যায় চলে এলাম বন্ধু মাসুমের ঘরে। মাসুম আমার ছেলেবেলার বন্ধু। দেখা হলো সাহেদার সাথে দীর্ঘ ২০ বছর পর। সাহেদা মাসুমের ছোট বোন লন্ডনে শহরে থাকে। চম্পা ভাবির মজাদার খাবার দিয়ে রাতের ডিনার শেষ করলাম সবাই। সেজন্য ভাবি তো একটা ধন্যবাদ পেতেই পারে।
অনেক সুন্দর স্মৃতি নিয়ে লন্ডন থেকে বিদায় নেব। চোখে মুখে থাকবে নানা রঙের স্মৃতি। রাত সাড়ে ৮টায় ম্যানচেসটারের পথে রওনা দিয়ে রাত সাড়ে ১২টায় বাড়ি পৌঁছলাম।